বাড়তি এ ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপুল অংকের ঋণ করেছে পতিত সরকার। গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানার প্রত্যাশা করেছিলেন সবাই। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগের সরকারের ধারাবাহিকতা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেটিকে কাজে লাগাতে পারেনি।
চলতি অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করেছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ব্যয়ের জন্য ৫ লাখ ৬ হাজার ৯৭১ কোটি ও উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের জন্য ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া খাদ্য হিসাব পরিচালনায় ১১৯ কোটি এবং নিট ঋণ ও অগ্রিম বাবদ ৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাজেটে বরাদ্দ থাকা পরিচালন ব্যয়ের ৬২ দশমিক ১ শতাংশ বা ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সময়ে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের ২৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বা ৭১ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দুই খাত মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, যা মূল বাজেটের ৪৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
প্রতি বছরই বাজেটের শতভাগ বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয় সরকার। অর্থবছরের শেষ তিন মাসে বাজেট বাস্তবায়নের গতি বেশ বেড়ে যায়। আর অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রতি বছরই অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রবণতা দেখা যায়। এতে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে। সর্বশেষ গত দুই অর্থবছরেও ঘোষিত বাজেটের শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঘোষিত বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার। সেই অর্থবছরে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছিল ৬ লাখ ২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা, যা মূল বাজেটের ৭৯ শতাংশ। আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের ৮৪ দশমিক ২১ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছিল।
সরকারের খাতভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সবচেয়ে বেশি ৭৫ দশমিক ৪১ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে সাধারণ সরকারি সেবা খাতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৪২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এ খাতে সরকারের ব্যয়ের মধ্যে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সাধারণ সরকারি সেবা খাতে অর্থ বিভাগের ব্যয় হয়েছে ৬৯ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।
সুদের হার বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ঋণের বিপরীতে সরকারের সুদ পরিশোধের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ৯৬ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৭৬ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এ সময়ে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ। মূলত অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে ৮১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। যেখানে আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৬৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের সরকারের করা ঋণের সুদ বর্তমান সরকারকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকারের খরচ আরো বেড়েছে। সামনে ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে না পারলে সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশ প্রশাসনেও দেশব্যাপী পরিবর্তন হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারি অনেক সাবেক কর্মকর্তাকে পদোন্নতিসহ ভূতাপেক্ষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর ফলেও সরকারের ব্যয় বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে সামনে এ বিষয়গুলো আগের মতো স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এলে এ খাতে সরকারের ব্যয়ও কমে আসবে।’
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ৩৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৩৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কৃষি খাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ সময়ে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা।
প্রতিরক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ২১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১৮ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ১৫ শতাংশ। জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১৬ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তথ্য-উপাত্তই বলে দিচ্ছে যে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগের গতানুগতিক ধারাই বজায় রয়েছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার হয়তো হাত দিতে চায়নি। আরেকটি বিষয় হতে পারে যে মূল্যস্ফীতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে। তার পরও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ব্যয় কাটছাঁটের মাধ্যমে কমানোর সুযোগ ছিল। কিছু নির্ধারিত ব্যয় থাকে, যেগুলো কমানো সম্ভব নয়। কিন্তু তার পরও অপচয় বন্ধের চেষ্টা করা হলেও কিছু ব্যয় কমানো যেত। তবে কমানো তো যায়ইনি বরং ব্যয় আরো বেড়েছে। এ বছর যেহেতু কমানো যায়নি, ফলে পরবর্তী সময়ে আর কমানো সম্ভব নয়। সামনে নির্বাচনের কারণে বর্তমান সরকারের বিদায়ের সময় চলে আসবে তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া আরো সম্ভব হবে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সুযোগ ছিল ব্যয় কমানোর মাধ্যমে একটি নজির তৈরি করার এবং সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা ছিল ব্যতিক্রম কিছু দেখার, কিন্তু সেটি হয়নি।’
সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১৮ হাজার ১০৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। যেখানে আগের অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ১৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৬ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আবাসন খাতে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় খাতে ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা খাতে দশমিক ১২ শতাংশ ব্যয় কমেছে।
সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। এমনকি চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে তার চেয়ে সরকারের ব্যয় হয়েছে আরো বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ৩ লাখ ৯ হাজার ৫৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর বিপরীতে এ সময়ে পরিচালন, উন্নয়ন ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি হয়েছে ৭৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। এ ঘাটতি মেটাতে এ সময়ে সরকারকে ৮০ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকার ঋণ নিতে হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬৫ হাজার ৪৪৭ কোটি ও বিদেশী উৎস থেকে ১৪ হাজার ৯০৭ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ব্যয় কমিয়ে আনার মাধ্যমে একটি উদাহরণ তৈরির পাশাপাশি কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত সেটি পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আগের বাজেটগুলোর মতোই বর্তমানে ব্যয় করা হচ্ছে, এটি দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল আগের সরকারের যে বাজেট ছিল সেটি বর্তমান সরকার সংশোধনের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রোধ করবে এবং এজন্য তারা সময়ও পেয়েছে। তাছাড়া অর্থনীতি যেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এটি প্রয়োজনও ছিল, কিন্তু কিছুই হয়নি। তাহলে পরিবর্তনটা হলো কোথায়? বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নজির তৈরি করতে না পারার কারণে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার গতানুগতিক পথেই হাঁটবে। বর্তমান সরকার ব্যয় কমাতে পারলে সেটি পরবর্তী সরকারের ওপর একটি চাপ হিসেবে কাজ করত। বর্তমান সরকার আগের মতোই আমলাতন্ত্রের যে কাঠামো রয়েছে সেটিকেই অনুসরণ করেছে, অথচ সরকারের কিন্তু এ ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল। এর ফলে বর্তমান সরকার একটি সুযোগ হারিয়েছে। শুধু সরকার না, দেশও সুযোগ হারিয়েছে। চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসে আগের মতোই সরকারের খরচ আরো বাড়বে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও গতানুগতিক ধারা দেখা গেছে। তাছাড়া সম্প্রতি এনবিআরের কর্মচারীদের মধ্যে যে অসন্তোষ দেখা গেছে সেটির কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।’